লেখক- আব্দুল কাদের
চারপাশের যান্ত্রিক ব্যস্ততা, ইটের দেওয়াল আর কংক্রিটের অরণ্য পেরিয়ে নীরবে বয়ে চলে এক অদৃশ্য ধারা; সেটি হলো শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সুকোমল প্রবাহ। প্রবুদ্ধ মননশীল কলাম কিংবা সাহিত্য সাময়িকীর পাতায় চোখ রাখলেই এই চিরন্তন সত্যটি মূর্ত হয়ে ওঠে যে, মানুষের বাহ্যিক প্রাপ্তির পাল্লা যতই ভারী হোক না কেন, তার অন্তর্লোক যদি নান্দনিকতার আলোয় উদ্ভাসিত না হয়, তবে সে প্রগতি কেবল খণ্ডিত, বিবর্ণ এবং আত্মাহীন এক কাঠামো মাত্র। নাগরিক কোলাহল থেকে দূরে, নিভৃত মনের উর্বর জমিনে চর্চা করা এই সাহিত্য-সংস্কৃতিই মূলত একটি জাতির আত্মিক পরিচয়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দলিল।
আধুনিকতার প্রবল স্রোতে মানুষ যখন ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক ও অনুভূতিহীন হয়ে পড়ে, তখন সাহিত্য ও শিল্পকলা তার অন্তরে সুকোমল দয়ার্দ্রতা ও মানবিকতার বীজ রোপণ করে। কোনো প্রাবন্ধিকের সুগভীর পঙ্ক্তিমালা কিংবা কবির অব্যক্ত কথামালা যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন তা কেবল অক্ষরের যান্ত্রিক বিন্যাস থাকে না; বরং তা আমাদের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা মানুষটাকে ঝাঁকিয়ে জাগিয়ে তোলে। একেই তো আমরা বলি শিল্পিতবোধ। এই বিশেষ বোধ মানুষকে চারপাশের রুক্ষতা, স্বার্থপরতা ও গ্লানি থেকে দূরে সরিয়ে একটুখানি সৌন্দর্য, সহমর্মিতা আর ভালোবাসায় বাঁচতে শেখায়। এটি হলো আত্মার এমন এক নিভৃত শুশ্রূষা, যা যান্ত্রিকতার ক্ষতে গভীর প্রলেপ লাগায়।
আমরা যতই আধুনিকতার সোপান বেয়ে ওপরে উঠি না কেন, আমাদের নাড়ির সংযোগ তো গাঁথা রয়েছে আবহমান বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির গভীরে। বাউলের একতারা, মাটির টান, লোকনাট্য কিংবা গ্রামীণ মেলা—এসবের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বাঙালি মানসের আদি ও অকৃত্রিম নির্যাস। বিশ্বায়নের এই যুগে মুঠোফোনে পৃথিবী হাতের মুঠোয় চলে এলেও, নিজস্ব কৃষ্টিকে বিসর্জন দিয়ে টেকসই মনন গড়ে তোলা অসম্ভব। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কিংবা কামরুল হাসানের ক্যানভাসে প্রস্ফুটিত বাংলার রূপ আধুনিক মননকে যুগ যুগ ধরে ঋদ্ধ করে চলেছে। এই শেকড়সন্ধানই আমাদের বিশ্বদরবারে স্বকীয় পরিচয় দান করে।
আমাদের সমাজকাঠামোর বুদ্ধিজীবী ও প্রবুদ্ধ মধ্যবিত্ত শ্রেণিটিই মূলত শিল্প-সাহিত্যের প্রধান প্রাণকেন্দ্র এবং নিভৃত সাধক। প্রতিকূল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করতে করতেও এই মানুষগুলোই বইয়ের পাতায় কিংবা কোনো ছোট্ট লিটল ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে খুঁজে ফেরেন মুক্তবুদ্ধির খোরাক। অমর একুশে বইমেলা বা সাহিত্যের আসরগুলোতে তরুণ প্রজন্মের যে প্রাণোজ্জ্বল উপস্থিতি দেখা যায়, তা প্রমাণ করে যে মনের খোরাক কখনো ফুরোবার নয়। এই পাঠপ্রিয়তা, লিটল ম্যাগাজিনের সাহসী উচ্চারণ আর মুক্তচিন্তাই সমাজকে ধীরে ধীরে এক আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে টেনে নিয়ে যায়।
তবে সমস্ত আলোর মাঝেও কিছু ছায়া এসে পড়ে। সমসাময়িককালে সংস্কৃতির নামে ভাসাভাসা বিনোদন, চটজলদি জনপ্রিয়তার স্রোত এবং মেকি বিষয়বস্তু আজ মননশীলতার জমিনকে গ্রাস করতে চাইছে। এই চটজলদি সংস্কৃতির যুগে দাঁড়িয়ে মৌলিক সাহিত্য বা গভীর শিল্পচর্চা টিকিয়ে রাখাটা আজ এক বড় বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে কেবল শহরকেন্দ্রিক চর্চায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; মফস্বল থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনপদের প্রতিটি পাড়ায় পাঠাগার আন্দোলন, বই পড়ার অভ্যাস এবং মননশীল চর্চার হাওয়া ফিরিয়ে আনতে হবে।
শিল্প ও সাহিত্য কোনো অলংকারিক বিলাসিতা বা নিছক শৌখিনতা নয়, বরং এটি একটি সুস্থ, মানবিক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত। ইট-পাথরের দালানকোঠা বা অর্থনৈতিক সূচক দিয়ে হয়তো একটি দেশের অবকাঠামো মজবুত করা যায়, কিন্তু মানুষের মনের সৌন্দর্য বিকাশ ও আত্মিক সুষমা আনতে হলে নিভৃতের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার কোনো বিকল্প নেই। সমস্ত কৃত্রিমতা, সংকীর্ণতা আর যান্ত্রিক কোলাহল পেরিয়ে শিল্পিতবোধে শাণিত এক মননশীল জাতিই কেবল অন্ধকার ভেদ করে আলোর মশাল জ্বালাতে পারে। কারণ, দিনশেষে মানুষের হৃদয়ের জমিনেই রচিত হয় সভ্যতার প্রকৃত ইতিহাস, যেখানে সাহিত্য ও সংস্কৃতির নিভৃত সাধনা চিরকাল মানুষকে এক মানবিক ও সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখাবে।
Leave a Reply