বিদ্যুৎ সংকট: দোষারোপ নয়, চাই সাশ্রয়-সচেতনতা ও টেকসই সমাধান
পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি : পীরগঞ্জে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে জনমনে উদ্বেগ—অপচয় রোধ, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক জীবন যেন থমকে দাঁড়ায়। রাতের অন্ধকার থেকে কৃষকের সেচ, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শিল্পকারখানা—জীবনের প্রতিটি স্তরেই বিদ্যুতের প্রয়োজন অপরিসীম। কিন্তু চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের ভারসাম্য নষ্ট হলে বিদ্যুতের সংকট শুধু অন্ধকারই নামায় না, থামিয়ে দেয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার গতি।
বর্তমান সময়ে বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ সরকারকে দায়ী করছেন, কেউ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতিকে কারণ হিসেবে দেখছেন। কিন্তু শুধু সরকারকে দোষারোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না। সংকট মোকাবিলায় সরকার, বিদ্যুৎ বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ বাঁচানো মানেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা—এই সত্যটি এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় বাতি, ফ্যান ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার কমাতে হবে।
বিশেষ করে প্রচণ্ড গরমে এসির ব্যবহার হতে হবে প্রয়োজনভিত্তিক ও সাশ্রয়ী। সরকারি-বেসরকারি অফিসে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা কার্যকর করা যেতে পারে।
দিনের আলো যথাসম্ভব কাজে লাগানো, অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখা এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। অন্যদিকে শহর ও গ্রামাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যানবাহন চার্জ দেওয়ার সময় বিদ্যুতের ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়, তা কমাতে নির্ধারিত চার্জিং স্টেশন, অফ-পিক আওয়ারে চার্জিং এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
বিদ্যুৎ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ।
অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বাজার, মসজিদ-মাদ্রাসা ও সরকারি স্থাপনাগুলোর ছাদে পর্যায়ক্রমে সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে কৃষিক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক সেচপাম্পের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো গেলে একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ওপর চাপও কমবে।
এ জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় বিষয়ে কর্মশালা, গণসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি। মানুষকে শুধু ‘বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন’ বললেই হবে না—কীভাবে সাশ্রয় করতে হবে, কেন করতে হবে এবং এর মাধ্যমে পরিবার ও রাষ্ট্র কীভাবে উপকৃত হবে, সেটিও বোঝাতে হবে। তবে বিদ্যুৎ খাতের সংকট মোকাবিলায় সুশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ সংযোগ, বিদ্যুৎ চুরি, মিটার কারসাজি, অপচয় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ সঞ্চালনব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে বিদ্যুৎ সিস্টেম লস কমাতে হবে।
পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন করতে হবে। শুধু আজকের সংকট মোকাবিলা নয়, আগামী দিনের চাহিদা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করতে হবে।
বিদ্যুৎ সংকট কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়—এটি রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত চ্যালেঞ্জ। তাই এখন প্রয়োজন দোষারোপের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি।
আমাদের মনে রাখতে হবে—
একটি বাতি অপ্রয়োজনে জ্বালানো মানে শুধু একটি ইউনিট বিদ্যুতের অপচয় নয়; এটি জাতীয় সম্পদের অপচয়।
একটি এসি অপ্রয়োজনে চালানো, একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র অকারণে সচল রাখা কিংবা বিদ্যুৎ চুরি—সবকিছু মিলেই তৈরি হয় বড় সংকট। তাই বিদ্যুৎ সংকটের অন্ধকার ভেদ করতে হলে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে কমাতে হবে অপচয়। বাড়াতে হবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, আধুনিক করতে হবে সঞ্চালনব্যবস্থা, বন্ধ করতে হবে বিদ্যুৎ চুরি ও দুর্নীতি এবং গড়ে তুলতে হবে সচেতন নাগরিক সমাজ। বিদ্যুৎ শুধু
Leave a Reply